Deshprothikhon-adv

কারসাজি হোতাদের স্বার্থেই আটকে আছে ‘বাইব্যাক আইন’

0

biback-lowশেয়ারবার্তা ২৪ ডটকম, ঢাকা: বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের পর দীর্ঘ চার বছরেরও অধিক সময় অতিক্রান্ত হলেও আলোর মুখ দেখেনি বাইব্যাক বা শেয়ার পুনঃক্রয় সংক্রান্ত আইন। নতুন কোম্পানি আইনে বাইব্যাক অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেয়ার পর এ বিষয়ে আর কোনো অগ্রগতি হয়নি। বিনিয়োগকারীদের পুঁজির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাইব্যাক আইন বাস্তবায়ন অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।

বাইব্যাক হচ্ছে অধিমূল্যসহ (প্রিমিয়াম) কোনো কোম্পানি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার পর শেয়ার দর প্রাথমিক মূল্যের চেয়ে কমে গেলে ওই কোম্পানি কর্তৃক বাজার থেকে শেয়ার পুনঃক্রয়ের বিধান। এটা চালু হলে বিনিয়োগকারীরা বড় ধরনের লোকসানের হাত থেকে রক্ষা পাবেন। পৃথিবীর অনেক দেশে এ পদ্ধতি প্রচলিত থাকলেও দেশে বিদ্যমান কোম্পানি আইনে তা ছিল অনুপস্থিত। বরং কোনো এক অজানা কারণে আটকে আছে এ আইন চালুর প্রক্রিয়া।

বাইব্যাক হচ্ছে একটি বিধান। যার আওতায় কোনো কোম্পানির শেয়ার মূল্য যদি অফার মূল্যের (প্রিমিয়ামসহ) নিচে নেমে যায় বা কমে যায় তবে ওই কোম্পানি কর্তৃক স্টক এক্সচেঞ্জগুলোর মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে শেয়ার পুনঃক্রয় করতে বাধ্য থাকবেন।

কারণ অনুসন্ধানে জানা গেছে, পুঁজিবাজার কারসাজিতে জড়িত হোতাদের স্বার্থ রক্ষা এবং আইনের হাত থেকে তাদের রক্ষা করতেই এ আইনটি পাস করতে পারছে না সরকার। যাদের মধ্যে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কয়েকজন এবং দেশের শীর্ষ স্থানীয় কয়েকজন প্রভাবশালী শেয়ার ব্যবসায়ী জড়িত। বিশেষ করে যেসব ব্যবসায়ীর কোম্পানি বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে অধিকহারে প্রিমিয়াম নিয়ে বাজারে এসেছে, তারা রাজনৈতিক বা আর্থিক প্রভাব খাটিয়ে এ আইন চালু বা বাস্তবায়নের রাস্তা বন্ধ করে রেখেছেন।

এ মুহূর্তে বিনিয়োগকারীদের পুঁজির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাইব্যাক আইন বাস্তবায়ন অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা। কারণ বাইব্যাক আইনের আওতায় এলে কোম্পানিগুলোর বাজারে আসার সময় আর দুর্নীতি করবে না। ফলে আইপিও’র শেয়ার লেনদেনের প্রথম কয়েকমাস বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগ নিরাপদ থাকবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছিুক এক সিকিউরিটিজ হাউজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষায় সরকারের পক্ষ থেকে বাইব্যাক আইন চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু একটি স্বার্থান্বেষী মহলের কারণে আইনটি আজও আলোর মুখ দেখেনি। আইনটি এখন কোথায় আছে তা স্পষ্ট নয়। আইনটি চালুর বিষয়ে সংশয় প্রকাশ করে তিনি সরকার ও পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে দ্রুত এ আইন চালুর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান।

বাইব্যাক বা শেয়ার পুনঃক্রয় আইন কী?: আগেই বলা হয়েছে, বাইব্যাক হচ্ছে একটি বিধান। যার আওতায় কোনো কোম্পানির শেয়ার মূল্য যদি অফার মূল্যের (প্রিমিয়ামসহ) নিচে নেমে যায় বা কমে যায় তবে ওই কোম্পানি কর্তৃক স্টক এক্সচেঞ্জগুলোর মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে শেয়ার পুনঃক্রয় করতে বাধ্য থাকবেন।

যেমন: কোনো কোম্পানির ২০ টাকা প্রিমিয়াম ও ১০ টাকা ফেস ভ্যালুসহ মোট ৩০ টাকা মূল্য নিয়ে আইপিও’র মাধ্যমে বাজারে তালিকাভুক্ত হলো। এখন ওই কোম্পানির লেনদেন শুরু হওয়ার দিন থেকে পরবর্তী ৩ থেকে ৬ মাসের মধ্যে যদি শেয়ার দাম ৩০ টাকার নিচে নেমে আসে তবে কোম্পানি কর্তৃপক্ষ, স্পন্সর এবং ইস্যু ম্যানেজার ওই শেয়ার বাজার থেকে ৩০ টাকা দরে পুনঃক্রয় করতে বাধ্য থাকবেন।

এদিকে বাইব্যাক আইন বাস্তবায়িত না হওয়ায় পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত অনেক কোম্পানির শেয়ার ফেসভ্যালুর নিচে অবস্থান করছে। এতে লোকসানে পড়ছেন বিনিয়োগকারীরা। ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীরা মনে করছেন, বাইব্যাক আইন থাকলে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যেত। ২০১২ সালে বাইব্যাক আইনের খসড়া করা হলেও এখনো তা চূড়ান্ত অনুমোদনের উদ্যোগ নেই। ফলে আলোর মুখ দেখছে না আইনটি।

বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০১১ সালের শুরুর দিকে পুঁজিবাজারে বড় ধরনের বিপর্যয়ের পর সরকার কোম্পানি আইন সংস্কার করে বাইব্যাক অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেয়। ২০১২ সালে আইনটির খসড়া করা হয়। এটি কোম্পানি আইনের অংশ বলে বাইব্যাক মূলত কোম্পানি আইনে অন্তর্ভুক্ত হবে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের সুপারিশে কোম্পানি আইন সংশোধন করে বাইব্যাক ধারা অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। বিদ্যমান কোম্পানি আইন সংশোধন করে ৫৮ ধারার পর তিনটি উপধারা সংযোজন করে তা সংসদে পাসের মধ্য দিয়ে বাইব্যাক নিয়ম চালু করা হবে।

বাইব্যাক আইনের চূড়ান্ত খসড়ায় বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি), বাংলাদেশ ব্যাংক, ইনস্টিটিউট অব কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএমএবি), রে

জিস্ট্রার অব জয়েন্ট স্টক কোম্পানিজ (আরজেএসসি), দ্য ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএবি), ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড সেক্রেটারিজ অব বাংলাদেশ (আইসিএসবি) এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয় মতামত দেয়। সর্বশেষ ২০১৫ সালের জুলাইয়ের মধ্যে বাইব্যাক আইনের খসড়া অনুমোদন হওয়ার কথা থাকলেও এ ব্যাপারে কোনো অগ্রগতি হয়নি।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দুর্বল মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানিকে তালিকাচ্যুত করা হলে এর উদ্যোক্তারা বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে শেয়ার বাইব্যাক করে নেন। তাছাড়া এ ধরনের কোম্পানিকে স্টক এক্সচেঞ্জ অবসায়ন ঘোষণা করে অবশিষ্ট সম্পদ আনুপাতিক হারে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ভাগ করে দেয়া হয়। কিন্তু বর্তমান কোম্পানি আইন-১৯৯৪ অনুসারে এ ধরনের কোনো ব্যবস্থা নেই।

কোম্পানিগুলো পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, বেশিরভাগ কোম্পানি আইপিওতে আসার পর তার শেয়ারদর ইস্যু মূল্যের নিচে নেমে আসছে। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। বাইব্যাক আইন চূড়ান্ত অনুমোদন পেলে বিনিয়োগকারীরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি থেকে রক্ষা পেতেন।

এ প্রসঙ্গে পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদের সভাপতি মিজানুর রশিদ চৌধুরী বলেন, কোম্পানিগুলোর হীনস্বার্থ বাস্তবায়নের হাতিয়ার বাইব্যাক আইন না থাকা। এ আইন হলে কোম্পানিগুলো বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে কোনো টালবাহানা করতে পারবে না। ব্যবসা না করতে পারলে বিনিয়োগকারীদের টাকা ফেরত দিতে হবে। বিনিয়োগও অনেকদিন আটকে থাকবে না।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) পরিচালক রকিবুর রহমান বলেন, সম্প্রতি শীর্ষ ব্রোকারদের বৈঠকে বাইব্যাক আইন বাস্তবায়ন বিষয়ে কথা হয়। কিন্তু এ আইন চালু হলে কোম্পানি অধিক প্রিমিয়াম দাবি করলে সেখানে কিছুটা হলেও বাধা দেবে স্পন্সর এবং ইস্যু ম্যানেজার। কারণ, তারা নিজেরা নিজেদের বিপদ ডেকে আনতে চাইবে না। এতে ভালো কোম্পানি বাজারে আসার সুযোগ পাবে।

এ বিষয়ে পুঁজিবাজার বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. আবু আহমেদ বলেন, আমার মনে হয় বাইব্যাক করানোর চেয়ে ভালো কোম্পানি বাজারে আনা বিশেষ প্রয়োজন। সরকার শেয়ার ছাড়ার কথা থাকলেও তার কোনো পদক্ষেপ দেখছি না। এছাড়াও দেশে ব্যবসা করছে এমন বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে আনতে পারলে বাজার ঘুরে দাঁড়াবে বলে মনে করেন তিনি।

জানা যায়, দেশের পুঁজিবাজার থেকে প্রিমিয়ামের নামে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন সুযোগ সন্ধানীরা। বাজার থেকে ১৪০০ শতাংশেরও বেশি প্রিমিয়াম নেয়ার নজিরও রয়েছে। তাই প্রিমিয়াম বন্ধে বাইব্যাক আইন অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।

বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাইব্যাক নিশ্চিত হলে প্রিমিয়াম বাণিজ্য বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি বাজারে স্বচ্ছতা আসবে। বাইব্যাক কার্যকর হলে কোম্পানি কর্তৃপক্ষ, স্পন্সর এবং ইস্যু ম্যানেজার সবারই দায়বদ্ধতা বাড়বে। তারা জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকবে। কারণ শেয়ারগুলো এসব প্রতিষ্ঠানকেই (কোম্পানি, স্পন্সর ও ইস্যু ম্যানেজার) ক্রয় করে নিতে হবে। নিয়ম অনুযায়ী সেটা বাইব্যাক কিংবা প্রাইস পেগিং যেটির  আওতায় পড়ুক তার দায়ভার নিতে হবে কোম্পানি, স্পন্সর অথবা ইস্যু ম্যানেজারকে। সুত্র: দৈনিক দেশ প্রতিক্ষণ, দেশ প্রতিক্ষণ ডটকম

Comments are closed.