Deshprothikhon-adv

রেনউইক যজ্ঞেশ্বর কারসাজিতে কারা জড়িত, নিরব নিয়ন্ত্রক সংস্থা

0
Share on Facebook0Share on Google+0Tweet about this on TwitterPin on Pinterest0Share on LinkedIn0Share on Yummly0Share on StumbleUpon0Share on Reddit0Flattr the authorEmail this to someonePrint this page

renwick lagoশেয়ারবার্তা ২৪ ডটকম, ঢাকা: পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত প্রকৌশলী খাতের কোম্পানি রেনউইক যজ্ঞেশ্বরের কারসাজিতে কারা জড়িত এ প্রশ্ন খোদ এখন বিনিয়োগকারীদের মুখে মুখে। কোন কারন ছাড়াই টানা দর বাড়ছে এ কোম্পানির শেয়ারের দর। লাগামহীন ভাবে বাড়ছে রেনউইক যজ্ঞেশ্বরের শেয়ারের দর। অথচ নিয়ন্তক দর্শকের মত নিরব ভুমিকা পালন করছে।

এছাড়া বিএসইসির রাডারে ধরা পড়ছেনা রেনউইক যজ্ঞেশ্বরের অস্বাভাবিক দর বৃদ্ধির কারন। ফলে বিনিয়োগকারীদের মনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। কোন অদৃশ্য শক্তিতে বাড়ছেই রেনউইক যজ্ঞেশ্বর। এর পেছনে কারা কলকাঠি নাড়ছে। বিএসইসি যেখানে বাজারের স্বার্থ কাজ করবে সেখানে নিরব ভুমিকা মেনে নেতে পারছেন না বিনিয়োগকারীরা।

চিনি শিল্প করপোরেশনের রেনউইক যজ্ঞেশ্বরের অ্যান্ড কোম্পানির শেয়ারদর কোনো মূল্য সংবেদনশীল কারণ ছাড়াই টানা বাড়ছে। এ বিষয়ে ডিএসইর নোটিশের জবাবে ‘অপ্রকাশিত মূল্য সংবেদনশীল তথ্য নেই’ বলে ওই কোম্পানির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। কিন্তু তারপরও শেয়ারদর বাড়ছে। এদিকে কোম্পানিতে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগের এক বছরের মধ্যেই অস্বাভাবিক দর বৃদ্ধি পাওয়ায় এ নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে।

তবে বাজারে গুঞ্জব রয়েছে গত ২২ জুলাই জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকল আধুনিকায়নে একটি প্রকল্প অনুমোদনের অগ্রিম খবর বাজারে ছড়াতে থাকে। এতে ১৮ জুলাই থেকেই কোম্পানিটির শেয়ারদর অস্বাভাবিকভাবে বাড়তে শুরু করে।

জানা যায়, ঠাকুরগাঁও সুগার মিলের পাশাপাশি সরকারি মালিকানায় থাকা অন্য চিনিকলের আধুনিকায়নে প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ সরবরাহ বা মেরামতের কাজ পাবে রেনউইক যজ্ঞেশ্বর। কোম্পানিটি প্রতিষ্ঠা করা হয় এ উদ্দেশ্যেই। এমনটি হলে কোম্পানির আয় কয়েক গুণ বেড়ে যাবে। এ খবরেই বাড়ছে কোম্পানির শেয়ার দর তা গোপন রাখছে কোম্পানি কর্তৃপক্ষ।

বিনিয়োগের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ রেনউইক যজ্ঞেশ্বরের অস্বাভাবিক দর বৃদ্ধির কারণ অনুসন্ধানে জানা যায়, এক বছর আগে কোম্পানিতে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ ছিল না। এরপর চলতি বছরের জুন পর্যন্ত রেনউইক যজ্ঞেশ্বরের ২ লাখ শেয়ারের ১৭ দশমিক ৮১ শেয়ার কিনেছে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা।

renwickএক বছরের মধ্যে ওই  রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানির শেয়ার সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা কিনে নেয়ার পরই কোম্পানিগুলোর শেয়ার দরের এই ঊর্ধ্বমুখী ধারা। কোম্পানিগুলোর শেয়ার নিয়ে কারসাজি হচ্ছে কি না- এমন প্রশ্নও উঠছে।

তাছাড়া বিএসইসি প্রতিষ্ঠানটির একটি মুল্যবান সার্ভিল্যান্স সফটওয়্যার আছে যেখানে কেউ সিরিয়াল ট্রেডিং, ইনসাইডার ট্রেডিং কিংবা সিন্ডিকেশন করলে সংগে সংগে ধরা পড়ে। কিন্তু পুঁজিবাজারে প্রকৌশল খাতে তালিকাভূক্ত যজ্ঞেশ্বর নিয়ে একটি সংঘবদ্ধ চক্র যা খেলছে তার কোনো তথ্য ওই যন্ত্রটি ধরতে পারছেনা। এই দর বৃদ্ধি এ যাবত কালের মধ্যে সর্বোচ্চ অস্বাভাবিক। যদিও ডিএসইর পক্ষ থেকে কোম্পানিটিকে ইতিমধ্যে দর বৃদ্ধির কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে।

ডিএসই’র তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে, গত ১৮ জুলাই কোম্পানিটির শেয়ার দর ছিল ২৯৩.৬০ টাকা। যা পরবর্তী ছয় কার্যদিবসে তা ৪৮৫.১০ টাকায় ওঠে আসে। আলোচ্য সময়ে কোম্পানিটির শেয়ার দর ১৯১.৫০ টাকা বা ৬৫ শতাংশ বেড়েছে। পরবর্তীতে দর বাড়ার কারণ জানতে চেয়ে কোম্পানিটিকে চিঠি পাঠায় ডিএসই। জবাবে কোম্পানিটিও মূল্য সংবেদনশীল তথ্য নেই বলে নিজেদের দায় সাড়ে। অথচ এরপরও কোম্পানিটির দর বাড়ার বিষয়টি থেমে থাকে নি। বরং পরবর্তী ৬ কার্যদিবসে তা আরও ২০৮.৭০ টাকা বেড়ে গতকাল ৬৯৩.৮০ টাকায় উঠে আসে। এর পর দর বাড়তে বাড়তে কোম্পানি গত মঙ্গলবার ৮শত ঘরে ছুই ছুই।

renwick 1তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, বেশ কিছুদিন ধরেই পুঁজিবাজারে অপেক্ষাকৃত দুর্বল শেয়ারের দর অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে। ডিএসইর পক্ষ থেকে কারণ দর্শানোর নোটিশ পাঠানো হলেও কোম্পানিগুলো গতানুগতিক দায়সারা জবাব দিচ্ছে। নিয়ম অনুযায়ী পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোন কোম্পানির শেয়ার দর বাড়ার নেপথ্যে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির মূল্য সংবেদনশীল তথ্য থাকার কথা। এর বাইরে কোন কোম্পানির শেয়ার দর বাড়লে তাকে অস্বাভাবিক দর বৃদ্ধির তালিকায় রেখে কারণ জানতে চেয়ে নোটিশ পাঠায় স্টক এক্সচেঞ্জগুলো। আর কোম্পানিগুলোও ওই নোটিশের জবাব দিতে বাধ্য থাকে।

চিনি শিল্প করপোরেশনের মুখপাত্র ও সচিব প্রকৌশলী মো. মাহবুবুর রহমান জানিয়েছেন, রেনউইক যজ্ঞেশর অ্যান্ড কোম্পানির শেয়ারদর ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার পেছনে উল্লেখ করার মতো কোনো মূল্য সংবেদনশীল তথ্য নেই। তারপরও কেন দর বাড়ছে তা জানতে ডিএসই কয়েক দফা চিঠি পাঠিয়েছে। আমরা চিঠির জবাব দিয়েছি। এর বাইরে আমাদের কিছুই বলার নেই’।

জানা যায়, বিএসইসি’র সার্ভিল্যান্স সফটওয়্যারের মাধ্যমে সিরিয়াল ট্রেডিং, ইনসাইডার ট্রেডিং কিংবা সিন্ডিকেশন ধরা পড়লেও কোনো কোম্পানির অস্বাভাবিক দর বৃদ্ধি কিংবা কারসাজি করে দর বৃদ্ধির ঘটনা ধরার কোনো সুযোগ নেই। ফলে রেনউইক যজ্ঞেশ্বরের আকাশচুম্বি দর বৃদ্ধির কোনো কারন জানাতে পারেনি শেয়ার বাজারের এই নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। তাদের মতে, যেহেতু দাম বেড়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে এ সফটওয়্যার কোনো এলার্ট দেয় না। তাই অস্বাভাবিকভাবে দর বাড়লেও কোনো কিছু ধরা পড়ে না। তারপরও যজ্ঞেশ্বরের অস্বাভাবিক দর বৃদ্ধির বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে জানিয়েছেন বিএসইসির উর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, পৃথিবীর কোন দেশেই সার্ভিল্যান্স সফটওয়্যারে অস্বাভাবিক দর বৃদ্ধির ব্যাপারে এলার্ট দেয় না। তাই কোম্পানিটিকে বিশ্লেষণ করে এ ধরনের ক্ষেত্রে কারসাজি হচ্ছে কিনা তা ধরতে হয়। তিনি আরও বলেন, আমাদের শেয়ারবাজারে এতগুলো কোম্পানির অস্বাভাবিক দর বৃদ্ধির কারণ অনুসন্ধানে যে লোকবল প্রয়োজন তা বিএসইসিতে নেই। তবে লোকবলের সঙ্কট আগামীতে কেটে যাবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

জানা যায়, এর আগে কোম্পানিগুলোর শেয়ারের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়ার ঘটনা ঘটলে তা অনুসন্ধান করে ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত করে তার রিপোর্ট জমা দিতে ডিএসইকে নির্দেশ দিয়েছিল বিএসইসি। ওই নির্দেশে বলা হয়েছিল, ১৫ দিনের ব্যবধানে যেসব শেয়ারের দাম ৫০ থেকে ১৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়বে সেসব কোম্পানির বিষয়ে অনুসন্ধান করে রিপের্টি দিতে হবে। কিন্তু নিয়ন্ত্রক সংস্থা হয়েও তদন্তের দায়িত্ব ডিএসইকে দেয়ায় ওই সময়ে বাজার সম্পর্কে বিএসইসি’র আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল।

এ প্রসঙ্গে আলোচনাকালে বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদের মহাসচিব আব্দুর রাজ্জাক বলেন, কোন কারণ ছাড়াই দুর্বল কোম্পানির শেয়ার দর বাড়ার বিষয়টি নতুন কিছু নয়। এটি দেশের পুঁজিবাজারে এটি নিত্য-নৈমিত্তিক বিষয় হয়ে দাড়িয়েছে। বরাবরের মতো স্টক এক্সচেঞ্জগুলো কারণ জানতে চেয়ে নোটিশ পাঠিয়ে নিজেদের দায় সাড়ে। ঠিক তেমনি কোম্পানি কর্তৃপক্ষও গতানুগতিক জবাব দিয়ে বিদ্যমান আইন পালন করে। এখন কথা হচ্ছে, সবাই যদি এভাবে দায় সাড়ে, তবে এর দায় কার!

তিনি আরও বলেন,ইতিপূর্বেকার দাম বৃদ্ধির সকল রেকর্ড ভঙ্গ করেছে রেনউইক যজ্ঞেশ্বর। তাও যদি কোম্পানিটি ভালো হতো তা মেনে নেয়া যেতো কিন্তু একটি পঁচা কোম্পানির এই দর বৃদ্ধিকে কোনো বিনিয়োগকারীই মেনে নিতে পারছেনা।

কোন কারণ ছাড়াই স্বল্পমূলধনী এ কোম্পানির শেয়ার দর অস্বাভাবিক হারে বাড়া বাজারের জন্য শুভ লক্ষন নয়। এটি কারসাজির একটি পূর্বাভাস। আর তাই বাজারের স্থিতিশীলতা রক্ষার পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের অপূরণীয় ক্ষতির হাত থেকে বাচাতে খুব দ্রুত এর কারণ অনুসন্ধানপূর্বক কারসাজির সঙ্গে জড়িতদের শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।

গুজব সৃষ্টি করে রেনউইক যজ্ঞেশ্বরের শেয়াররের অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধির অভিযোগ করছেন বিনিয়োগকারী ও বাজার-সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, অতীতেও গুজবের কারণে কিছু কোম্পানির শেয়ার কিনে অনেক বিনিয়োগকারী প্রতারিত হয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রে আবার দরবৃদ্ধির সুস্পষ্ট কারণ থাকার পরও যথাসময়ে তা জানায়নি সরকারি কোম্পানি। তারই উদাহরণস্বরূপ হিসেবে ইস্টার্ন লুব্রিক্যান্টসের কথাও বলছেন তারা।

বাজার-সংশ্লিষ্টরা বলেন, ব্যবসার ধরন পরিবর্তন করে হঠাৎ অস্বাভাবিক মুনাফা দেখায় পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত এ প্রতিষ্ঠানটি। তবে এর আগেই শেয়ারদর তিন গুণ হয়ে যায়। শেয়ারদর বৃদ্ধির পর কোম্পানি মূল্য সংবেদনশীল তথ্য প্রকাশ করায় বঞ্চিত হন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। এ বিষয়টি নিয়ন্ত্রক সংস্থার অগ্রাধিকার দিয়ে দেখা দরকার। অনুসন্ধান করে এসব ঘটনার মূল কারণও প্রকাশ করা দরকার।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক সাইফুর রহমানের সাথে কথা বললে তিনি জানান, আমরা বিনিয়োগকারীদের সব সময়ই দুর্বল কোম্পানির শেয়ার ক্রয় ও গুজবে কান না দেওয়ায় বিনিয়োগকারীদের সচেতন করে থাকি। আমরা সব সময়ই বিনিয়োগকারীদের কোম্পানির পক্ষ থেকে পাওয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই বিনিয়োগ করার কথা বলি। কারণ কোম্পানি যেকোন উদ্যোগ নেক পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার পর তার তথ্য নিয়ন্ত্রণ সংস্থা বা শেয়ার মার্কেট সাথে সম্পর্কিত প্রতিষ্ঠানকে আগে জানাতে হয়। তারপরই তা প্রকাশ করা হয়।

উল্লেখ্য ‘এ’ ক্যাটাগরির এ কোম্পানিটি ১৯৮৯ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়। ২০ কোটি টাকা অনুমোদিত মূলধনের এ কোম্পানিটির পরিশোধিত মূলধনের পরিমাণ ২ কোটি টাকা। কোম্পানিটির পুঞ্জীভূত লোকসানের পরিমাণ ৮ কোটি ১৫ লাখ টাকা। সর্বশেষ ২০১৫ সমাপ্ত বছরে কোম্পানিটি বিনিয়োগকারীদের জন্য ১২ শতাংশ ক্যাশ ডিভিডেন্ড দিয়েছে।

চলতি বছরের ৩০ জুন শেষে কোম্পানিটির ২০ লাখ শেয়ারের মধ্যে সরকারের হাতে ৫১.০৫ শতাংশ, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে ১৭.৭৭ শতাংশ এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে ৩১.১৮ শতাংশ শেয়ার রয়েছে।

Comments are closed.