Deshprothikhon-adv

ব্রেক্সিটে নেতিবাচক প্রভাবের শঙ্কা কি বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে!

0

bexjitবিশেষ প্রতিনিধি, শেয়ারবার্তা ২৪ ডটকম, ঢাকা: ব্রেক্সিটের প্রভাবে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে কোন প্রভাব পড়বে কি, এ নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মাঝে আলোচনার শেষ নেই। অধিকাংশ বিনিয়োগকারীরা ব্রেক্সিটের প্রভাব নিয়ে দু:চিন্তায় রয়েছেন। এছাড়া বেশ কয়েকজন বিনিয়োগকারী শেয়ারবার্তা ২৪ ডটকমে ফোন করে এ বিষয়  প্রশ্ন করেছেন।

ইউরোপীয়ান ইউনিয়ন (ইইউ) হতে যুক্তরাজ্যের সদস্যপদ প্রত্যাহারের গণরায় বা ‘বেক্সিট’-এর ধাক্কা জিএসপি সুবিধার আওতায় বাংলাদেশের পণ্য রফতানি এবং বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহের ধারাকে প্রভাবিত করতে পারে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

পাশাপাশি যুক্তরাজ্যের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও যুক্তরাজ্য কর্তৃক বাংলাদেশে পরিচালিত বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মসূচি বাধাগ্রস্থ হতে পারে বলেও শঙ্কা প্রকাশ করেছে ব্যবসায়ীদের সংগঠন ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ড্রাস্ট্রি (ডিসিসিআই)।

সংস্থাটি বলছে, ব্রেক্সিট ইতোমধ্যে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। যা আন্তর্জাতিক ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পাশাপাশি ইউরোপের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের চলমান অগ্রগতির ধারাকে ব্যাহত করতে পারে। এ সিদ্ধান্ত সারাবিশ্বে নতুন একটি ভূ-রাজনৈতিক ধারার পাশাপাশি একটি ভূ-অর্থনৈতিক ধারাও সৃষ্টি করতে পারে।

উল্লেখ্য, ইউরোপ হলো বাংলাদেশি পণ্য রফতানির অন্যতম বৃহৎ বাজার। এছাড়া বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বৈদেশিক বিনিয়োগকারী দেশ হচ্ছে যুক্তরাজ্য। প্রতিবছর ব্রিটেনে ৩.৪ বিলিয়ন ডলার মূল্যমানের পণ্য রফতানি করে বাংলাদেশ। যার মধ্যে তৈরি পোশাক খাতের অবদান ২.৯ বিলিয়ন ডলার। এছাড়া বাংলদেশে থেকে উল্লেখ্যযোগ্য পরিমাণ অপ্রচলিত পণ্যও যুক্তরাজ্যে রফতানি হয়ে থাকে।

ঢাকা চেম্বার মনে করে, বেক্সিটের ফলে বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থা ও বৈশ্বিক মুদ্রাবাজার ব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রবণতা ও মন্দা অবস্থার সম্ভাবনা রয়েছে, পাশপাশি অন্যান্য মুদ্রার সঙ্গে পাউন্ডের বিনিময় হার কমে যাওয়ারও আশঙ্কা রয়েছে।

যদিও ইতোমধ্যে ডলারের বিপরীতে পাউন্ড ১০ শতাংশ এবং ইউরোর বিপরীতে ৩ শতাংশ কমেছে। এই ধারা বাংলাদেশকে প্রভাবিত করার সম্ভাবনাকে আরো ঘনীভূত করবে। ডলারের বিপরীতে পাউন্ড স্টারলিং ও ইউরোর অবমূল্যায়ন বাংলাদেশের রফতানি বাণিজ্যে, বিশেষ করে তৈরি পোশাক রফতানিতে মন্দা প্রভাব ফেলতে পারে।

আমাদের দেশের তৈরি পোশাকের মোট ৫৫ শতাংশ ইইউভুক্ত দেশগুলোতে ও ১২ শতাংশ ব্রিটেনে রফতানি হয়। ডলারের বিপরীতে পাউন্ডের অবমূল্যায়ন বাংলাদেশে রেমিটেন্স এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ প্রবাহে মন্দাবস্থা তৈরি করতে পারে।

পাশাপাশি ইইউ জোট থেকে যুক্তরাজ্য বের হয়ে গেলে বাংলাদেশ তৈরি পোশাক খাত হতে ২০২১ সালের মধ্যে ৫০ বিলিয়ন ডলার রফতানির আয়ের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে তাতেও বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। ডিসিসিআই সরকারের প্রতি বিষয়টিকে সক্রিয় বিবেচনায় নিয়ে এর সম্ভাব্য প্রভাব নির্ধারণ এবং ব্রিটেনের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা বা মধ্যস্থতার উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে।

lagoব্রিটেনের ইইউ ত্যাগ পরবর্তী আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য ডিসিসিআই ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ ও সংগঠন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আইন বিশেষজ্ঞ, অর্থনীতিবিদ, গবেষক এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের উপযুক্ত প্রতিনিধির সমন্বয়ে একটি উচ্চ পর্যায়ের জাতীয় কমিটি গঠন করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।

উল্লেখ্য, ‘ব্রেক্সিট’-এর পক্ষেই রায় দিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে বিদায় নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন ব্রিটেনের ৫২ শতাংশ মানুষ। আর, তা নিয়েই শুক্রবার দিনভর বিশ্বজুড়ে কেঁপে উঠল শেয়ার বাজার। আর ৩১ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন অবস্থানে নামলো পাউন্ড। কিন্তু ব্রিক্সিটের প্রভাবে বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে কোন প্রভাব পড়বে কি, এমন প্রশ্ন বিনিয়োগকারীদের।

তথ্যানুসন্ধানে দেখা যায়, গতকাল ভারতের সকালে সেনসেক্স পড়েছে ১০৯০ পয়েন্ট, নিফ্‌টি ৩৪৩ পয়েন্ট। ৩১ বছরের তলানি ছুঁয়েছে পাউন্ড, ডলারে টাকা এক ঝটকায় নেমেছে ৯৬ পয়সা। তবে কিছুটা অপ্রত্যাশিত প্রথম ধাক্কা কাটিয়ে উঠে বাজারের ঘুরে দাঁড়াতে খুব দেরি হবে না বলেই মনে করছেন ভারতীয় পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞরা এমন খবর প্রকাশ করেছে আনন্দবাজার।

বস্তুত, এ দিনই পরের দিকে ভারতের শেয়ার বাজার এবং টাকা তার হারানো জমি অনেকটাই পুনরুদ্ধার করে। সেনসেক্সের ১০৯০ পয়েন্টের পতন লেনদেন বন্ধের সময়ে কমে দাঁড়ায় ৬০৪.৫১ পয়েন্টে। যার ফলে বাজার বন্ধের সময়ে সেনসেক্স সূচক স্থিতি হয় ২৬,৩৯৭.৭১পয়েন্টে।

অন্য দিকে নিফ্‌টি আগের দিনের থেকে ১৮১.৮৫ পয়েন্ট কমে দাঁড়ায় ৮০৮৮.৬০ পয়েন্টে। ডলারে টাকাও কিছুটা প্রাণ ফিরে পায়। এদিকে, দিনশেষে ভারতে ডলারের দাম ছিল ৬৭.৯৬ টাকা। তবে গত ৪ মাসের মধ্যে টাকা এতটা নীচে নামেনি।

শুক্রবার বাজার খোলার শুরু থেকেই গণভোটের ফলাফল দেখে হতাশ বিনিয়োগকারীরা শেয়ার বেচতে শুরু করেন। দ্রুতগতিতে পড়তে থাকে শেয়ারের দাম। তার সঙ্গে তাল রেখে নেমে আসে সূচকের পারা।

এদিকে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন থেকে ব্রিটেনের বিদায়কে (ব্রেক্সিট) ২০০৮ সালের মতো আরেকটি বৈশ্বিক মহামন্দার ইঙ্গিত বলে মনে করছেন কিছু বিশ্লেষক। কারণ ইতোমধ্যেই বিশ্বজুড়ে শেয়ারবাজার এবং বিনিয়োগ খাতে পুরোদমে আতঙ্ক বিরাজ করছে। বিনিয়োগকারীদের এই আতঙ্ক এবং বাজারের অচলাবস্থাকে বলা হচ্ছে ‘প্যানিক মোড’।

এরই মধ্যে ব্রিটেনের পুঁজিবাজারে ধস নেমেছে। ধস নেমেছে ইউরোপ, এশিয়া এবং ওয়াল স্ট্রিটেও। পৃথিবীর বড় বড় ব্যাংক যেমন- মার্কিন মুলুকের জেপি মরগ্যান, গোল্ডম্যান স্যাক্স, স্কটল্যান্ডের রয়্যাল ব্যাংক, বার্কলেস, ক্রেডিট সুইস এবং জার্মানির ডয়েচে ব্যাংক ভয়াবহ পতনের সম্মুখীন হয়েছে।

অন্যদিকে ব্রিটিশ মুদ্রা পাউন্ডের পতন হয়েছে আশঙ্কাজনক হারে। বিনিয়োগকারীরা এখন হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন তুলনামূলক নিরাপদ মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের দিকে। অথচ এর হার এখন ২০১২ সালের পর সর্বনিম্নে এসে দাঁড়িয়েছে। ১০ বছর মেয়াদী মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের হার এখন ১.৪ শতাংশ। বিপরীত চিত্র স্বর্ণের দামে। বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দাম বেড়ে গেছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, স্বর্ণের দাম বেড়ে যাওয়া বিনিয়োগকারীদের জন্য কোনো সুখবর বয়ে আনবে না। কারণ, গত সব অর্থনৈতিক মন্দা এবং বাজার পতনের সময় স্বর্ণের দাম চড়া ছিলো। শুক্রবার ওয়াল স্ট্রিটে বাজারের অস্থিরতা পরিমাপক সূচক বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪০ শতাংশ। মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ সম্প্রতি জানিয়েছে বাজারের চাপ মোকাবেলার জন্য তারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে তারল্য সরবরাহের আগাম প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে।

সিএনএনের রিপোর্টে বাজার বিশ্লেষকদের বরাত দিয়ে বিনিয়োগকারীদের শান্ত থাকতে বলা হয়েছে। এভারব্যাংক ওয়ার্ল্ড মার্কেটের প্রধান ক্রিস গ্যাফনে বলেন, ব্রিটেনের বেরিয়ে যাওয়া যতটা না অর্থনৈতিক সঙ্কট, তার চেয়ে বেশি রাজনৈতিক সঙ্কট। এতে তারল্য সঙ্কট তেমন একটা হবে না। তবে একটা বড় প্রভাব পড়তে পারে।

ভয়া ইনভেস্টমেন্ট ম্যানেজমেন্টের প্রধান মার্কেট স্ট্র্যাটেজিস্ট ডগলাস কোট বলেন, ইউরোপিয়ান সেন্ট্রাল ব্যাংক, ফেডারেল রিজার্ভ এবং অন্যান্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক সাধারণত বাজারের অস্থিরতা মোকাবেলার চেষ্টা করে ।

তবে তারপরও ব্রেক্সিট ক্ষণস্থায়ী অস্থিরতার জন্ম দেবে। কোট বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশে বলেন, আপনার বিনিয়োগ পরিকল্পনা হুট করে পাল্টাবেন না। বাজারে উত্থান-পতন থাকবেই। তাই তড়িৎ সিদ্ধান্ত না নেওয়াই ভাল। ব্রেক্সিট বাজারে সত্যিই নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে কি না তা পুরোপুরি বুঝতে আরও সময় লাগবে।

Comments are closed.