Deshprothikhon-adv

তিন ইস্যুতে পুঁজিবাজার স্থিতিশীলতার আভাস!

0
Share on Facebook0Share on Google+0Tweet about this on TwitterPin on Pinterest0Share on LinkedIn0Share on Yummly0Share on StumbleUpon0Share on Reddit0Flattr the authorEmail this to someonePrint this page
Share News
Share News

আমীনুল ইসলাম, শেয়ারবার্তা ২৪ ডটকম, ঢাকা: পুঁজিবাজারে লেনদেনে অস্থিরতা কাটতে শুরু করছে। সরকারের নীতি নির্ধারকসহ সব মহলে আন্তরিকতার ফলে গত সপ্তাহে বাজার কিছুটা স্থিতিশীলতার আভাস ছিল। ধারাবাহিক দরপতন ঠেকাতে স্টেক হোল্ডারদের নিয়ে নানামুখি তৎপরতা আর সরকারের পক্ষ থেকে বর্তমান বাজারের পরিস্থিত উন্নয়নের নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের পরামর্শে ঊর্ধ্বমূখী ধারায় ফিরেছে পুঁজিবাজার।

তেমনি ইতিবাচক অর্থনীতির ঊর্ধ্বগতির ফলে পুঁজিবাজার স্থিতিশীলতার দিকে যাচ্ছে। গত কয়েক সপ্তাহে টানা দরপতনের পর ইতিবাচক ধারায় ফিরছে দেশের পুঁজিবাজার। গত সপ্তাহে দেশের উভয় স্টক এক্সচেঞ্জেই সব ধরণের সূচকের পাশাপাশি বেড়েছে টাকার অংকে লেনদেনের পরিমাণ। তাই তিন ইস্যুতে পুঁজিবাজার স্থিতিশীলতার আভাস দিচ্ছে বলে মনে করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।

প্রথমত, পুঁজিবাজারে স্মরনকালের দরপতনের সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ব্রোকারেজ হাউজ মালিকরা। নিজেদের লোকসানে থাকার পাশাপাশি তাদের ব্রোকারেজ হাউজগুলো চালাতো হিমশিম খাচ্ছেন। তেমনি হাউজগুলো বছরের পর বছর লোকসান দিয়ে যাচ্ছেন।

বাজারের প্রাণ বলে খ্যাত এই মালিকদের ক্ষতি কমাতে শিগগিরই ২৫০ কোটি টাকা দিচ্ছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই)। মোট ৩৯৮ সদস্যকে লভ্যাংশ হিসেবে এ টাকা দিচ্ছে স্টক এক্সচেঞ্জ দুটি।

এ টাকার ৯০ শতাংশ বিনিয়োগ হবে পুঁজিবাজারে। আর বাকি ১০ শতাংশ ব্যয় হবে ব্রোকার হাউজের ব্যবস্থাপনায়। এর ফলে বেশির ভাগ ব্রোকারদের বিনিয়োগের সক্ষমতা বাড়বে। পুঁজিবাজারেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলেও মনে করেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।

আড়াইশ’ কোটি টাকার মধ্যে ডিএসই’র সদস্য ব্রোকার মালিকরা পাবেন প্রত্যেকে ৬৪ লাখ ৪০ হাজার টাকা আর সিএসইর ৩ লাখ ৮০ হাজার টাকা করে। সব মিলে ডিএসইর ২৫০ সদস্য পাবেন ১৬২ কোটি টাকা আর সিএসইর ১৪৮ সদস্য পাবেন ৩৪ কোটি ২০ লাখ টাকা। বাকি ২১ কোটি ৮০ লাখ টাকা যাবে সরকারের রাজস্ব খাতে।

এদিকে গত সপ্তাহে পুঁজিবাজারে বেড়েছে বাজার মূলধন ও পিই রেশিও। একই সঙ্গে বেড়েছে লেনদেন হওয়া অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ড ইউনিটের দর। সপ্তাহ শেষে দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) লেনদেন বেড়েছে ৩৬৫ কোটি টাকা বা ২১ দশমিক ৮১ শতাংশ।

বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গেল সপ্তাহে দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) প্রথম কার্যদিবস রোববার (৩ এপ্রিল) লেনদেনের শুরুতে ডিএসই’র বাজার মূলধন ছিল ৩ লাখ ৩ হাজার ৬৪১ কোটি ৫৬ লাখ ৩১ হাজার ৯২১ টাকায় এবং শেষ কার্যদিবসে বৃহস্পতিবার (৭ এপ্রিল) তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৯ হাজার ৩৪৬ কোটি ৫৩ লাখ ৬৯ হাজার ২১ টাকায়। অর্থাৎ সপ্তাহের ব্যবধানে বাজার মূলধন বেড়েছে পাঁচ হাজার ৭০৪ কোটি ৯৭ লাখ টাকা বা ১ দশমিক ৮৮ শতাংশ।

গত সপ্তাহে পাঁচ দিনে টাকার অংকে লেনদেন হয়েছে ২ হাজার ৪৩ কোটি ৩২ লাখ ১১ হাজার ২৩৬ টাকা। যা এর আগের সপ্তাহের চেয়ে ৩৬৫ কোটি ৮৭ লাখ টাকা বা ২১ দশমিক ৮১ শতাংশ বেশি। আগের সপ্তাহে ডিএসইতে লেনদেন হয়েছিল ১ হাজার ৬৭৭ কোটি ৪৪ লাখ ৪৭ হাজার ৫৮৮ টাকা।

একই সঙ্গে গত সপ্তাহে ডিএসইতে বেড়েছে টার্নওভারের পরিমানও। গড়ে প্রতিদিন টার্নওভার দাঁড়িয়েছে ৩৩৫ কোটি ৪৮ লাখ টাকায়। যা আগের সপ্তাহে ছিল ৩৩৫ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। অর্থাৎ সপ্তাহের ব্যবধানে টার্নওভার বেড়েছে ৭৩ কোটি ১৮ লাখ টাকা বা ২১ দশমিক ৮১ শতাংশ বেশি।

দ্বিতীয়দ, বিশেষ করে পুঁজিবাজারের সার্বিক উন্নয়নে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) বিনিয়োগকারীদের মাঝে আস্থা ফেরাতে নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহন করছে।

এর মধ্যে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) বাজার স্থিতিশীল করার লক্ষে বাংলাদেশ ব্যাংককে চারটি প্রস্তাব দিয়েছে। বর্তমান বাজারের ওপর বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানোর জন্য ব্যাংকের বাড়তি বিনিয়োগ সমন্বয়ের সময়সীমা বাড়ানোর কোন বিকল্প নেই বলে তারা মনে করেন।

সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকে গভর্নর ফজলে কবিরের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করে ব্যাংকের বিনিয়োগসীমার সংজ্ঞা পুনর্র্নিধারণের প্রস্তাব দিয়েছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই)। পুঁজিবাজারের উন্নয়ন ও বিনিয়োগ সক্ষমতা বাড়াতে ব্যাংকের বিনিয়োগসীমার সংজ্ঞা বাড়ানো প্রয়োজন বলে তারা মনে করছেন।

তৃতীয়ত, প্রতিনিধি দলটি পুঁজিবাজারের বৃহত্তর স্বার্থে এক্সপোজারের সমন্বয় সীমা ২০২০ সাল পর্যন্ত বাড়ানোর দাবী জানান। বাংলাদেশ ব্যাংকে গভর্নর ফজলে কবির তাদের দাবীর প্রেক্ষিতে ২০ সালের পরিবর্তে ১০১৮ সাল পর্যন্ত বাড়ানোর অঙ্গীকার করেন এবং খুব কম সময়ের মধ্যে তা সার্কূলার আকারে ঘোষণার কথা জনান।

পাশাপাশি বাজারে দ্রুত তারল্য বাড়াতে ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ জটিলতা নিরসনে যে যে পদক্ষেপ নেয়া যায় তারও বিশদ বিবরণ দেন প্রতিনিধি দলটি । গভর্নর এ বিষয়গুলো ধৈর্যের সাথে শুনেন এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে যেগুলো বাস্তবায়ন সম্ভব তা করার প্রতিশ্রুতি দেন।

উল্লেখ্য, ২০১২ সালের সংশোধিত ব্যাংক কোম্পানি আইনানুসারে পুঁজিবাজারে ব্যাংকগুলোর নিজস্ব পোর্টফোলিওতে বিনিয়োগ (একক ভিত্তিতে) মোট মূলধনের ২৫ শতাংশে এবং সাবসিডিয়ারি কোম্পানি ও পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্ট কোম্পানিকে প্রদত্ত ঋণসহ সমন্বিত বিনিয়োগ মোট মূলধনের ৫০ শতাংশে নামিয়ে আনার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

এজন্য চলতি বছরের ২১ জুলাই পর্যন্ত বিনিয়োগ সমন্বয়ের সময়সীমা নির্ধারিত রয়েছে। তবে পুঁজিবাজারে ব্যাংকের বিনিয়োগ সমন্বয়ের কারণে সেল প্রেসার তৈরি হওয়ায় এর প্রভাবে পুঁজিবাজারে নেতিবাচক অবস্থা তৈরি হয়। যার প্রেক্ষিতে পুঁজিবাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সংশ্লিষ্টরা ব্যাংকের বিনিয়োগ সমন্বয়ের সময়সীমা বাড়ানোর জন্য দাবি জানায়।

এ বিষয়ে সরকারের নীতি নির্ধারণী মহল থেকেও এ সময়সীমা আরো দুই বাড়ানোর বিষয়ে ইতিবাচক মত ব্যক্ত করা হয়েছে। এমনকি এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অর্থমন্ত্রী মন্ত্রণালয়কে নির্দেশনা দিয়েছেন।

তবে নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে এ বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেয়া আবশ্যক। আর ব্যাংকের বিনিয়োগ সমন্বয়ের সময়সীমা বাড়ানোর বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উদ্যোগের অপেক্ষায় রয়েছেন সাধারণ বিনিয়োগকারী এবং বাজার-সংশ্লিষ্টরা।

বাজার-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পুঁজিবাজারে ব্যাংকের বিনিয়োগ সমন্বয়ের সময়সীমা বাড়ানোর বিষয়ে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি, ডিএসই, সিএসই, বিএমবিএ, ব্রোকারেজ অ্যাসোসিয়েশন, সাধারণ বিনিয়োগকারীসহ পুঁজিবাজার-সংশ্লিষ্ট সকল মহল থেকেই দাবি উঠেছে।

এমনকি অর্থমন্ত্রী নিজেও এ বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে পুঁজিবাজার স্থিতিশীলতার স্বার্থে এ সময়সীমা বাড়ানোর বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব ব্যক্ত করেছেন। এখন শুধু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উদ্যোগের অপেক্ষা। ২০১০ সালের পর থেকেই পুঁজিবাজারে বেহাল অবস্থা বিরাজ করছে।

সে সময় ব্যাংকগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা ভঙ্গ করে পুঁজিবাজারে অতিরিক্ত বিনিয়োগ করেছিল। যার কারণে বাংলাদেশ ব্যাংক হঠাৎ করে ব্যাংকগুলোকে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ সমন্বয়ের নির্দেশনা দেয়। এর ফলে বাজারে সেল প্রেসার বেড়ে যায় এবং বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দেয়।

এর ফলশ্রতিতে দেশের পুঁজিবাজারে ১৯৯৬ সালের পর দ্বিতীয় বার ধস নামে। মূলত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা ভঙ্গ করে পুঁজিবাজারে অতিরিক্ত বিনিয়োগের কারণে এ ভয়াবহ ধস নামে। আর তাদের এ ভুলের খেসারত বিগত ৫ বছর ধরে বিনিয়োগকারীদের বয়ে বেড়াতে হচ্ছে।

এমনকি পুঁজি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে বিনিয়োগকারীদের আত্মহত্যার মতো ঘটনাও ঘটেছে। তাই পুঁজিবাজার তথা দেশের সার্বিক অর্থনীতির স্বার্থে পুঁজিবাজারে ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ সমন্বয়ের সময়সীমা বাড়ানোর বিষয়ে উদ্যোগ গ্রহণের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে ত্বরিত পদক্ষেপ প্রত্যাশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। আশা করি কেন্দ্রীয় ব্যাংক পুঁজিবাজারে নিরিখে বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে সময়সীমা বাড়ানোর বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।

এ বিষয়ে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) পরিচালক শাকিল রিজভী শেয়ারবার্তা ২৪ ডটকমকে বলেন, স্টেক হোল্ডারদের নিয়ে নানামুখি তৎপরতা আর সরকারের পক্ষ থেকে বর্তমান বাজারের পরিস্থিত উন্নয়নের নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের পরামর্শে বাজার পরিস্থিতি স্থিতিশীল রয়েছে। আশা করি দ্রুত বাজার পরিস্থিতি ঘুরে দাঁড়াবো। এছাড়া বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীরা যে কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগ করে বেশি মুনাফা পাবেন সাধারণত সে খাতেই বিনিয়োগ করে থাকেন।

Leave A Reply