Deshprothikhon-adv

পাঁচ ইস্যুতে পতনের বৃত্তে পুঁজিবাজার

0

sharebazer lagoআমীনুল ইসলাম, শেয়ারবার্তা ২৪ ডটকম, ঢাকা:   পুঁজিবাজারে লেনদেনে অস্থিরতা সেই সঙ্গে বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতা যেন কিছুতেই পিছু ছাড়ছে না। ইতিবাচক অর্থনীতির ঊর্ধ্বগতিতে ঘুরে ফিরে পতনের বৃত্তেই রয়েছে পুঁজিবাজার। নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীনতাকে পুঁজি করে ফায়দা লুটছে প্রাতিষ্ঠানিক ও বিদেশি বিনিয়োগকারীরা।

এমন পরিস্থিতিতে বাজারের লেনদেনে স্বাভাবিকতা ফিরাতে বাংলাদেশ ব্যাংক এবং পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের পরও স্বস্তি ফিরছে না বিনিয়োগকারী ও সংশ্লিষ্ট মহলে। তাছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমানের পদত্যাগে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে স্বস্তির কিছুটা বিরাজ করলে বাজারের প্রতি পুরোপুরো আস্থা বাড়ছে না। যার প্রভাব দেখা গেছে বুধবার সূচক ও কেনাবেচার পরিস্থিতিতে।

বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজারে তালিকাভুক্ত বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর শেয়ার দর সাধারণ বিনিয়োগকারীদের সীমার বাইরে। কিন্তু কোম্পানিগুলোর পর্যাপ্ত পরিমাণ শেয়ার বাজারে না থাকায় এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হচ্ছে। তাদের মতে, বাজারে মৌলভিত্তির কোম্পানিগুলোর অধিকাংশই বহুজাতিক বা বহুজাতিক মালিকানাধীন।
কিন্তু কোম্পানিগুলো শেয়ারের চাহিদার তুলনায় জোগান কম হওয়ায় বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

এছাড়াও নতুন বিনিয়োগকারীদের অসম্পৃক্ততা, নতুন তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর মুনাফার সংকট, দেশীয় কোম্পানিগুলোর মুনাফার অপ্রতুলতা ও আর্থিক প্রতিবেদনে কারসাজির মাধ্যমে কোম্পানিকে লোকসানি করায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বিনিয়োগকারীরা।  এমন পরিস্থিতিতে পুঁজিবাজার ইস্যুতে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সমন্বয়ের পাশাপাশি প্রয়োজন বাজার উন্নয়নে যুগোপযোগী পদক্ষেপ।

ডি-মিউচ্যুয়ালাইজেশন পরবর্তী নিয়ন্ত্রক সংস্থার সমন্বয়হীনতা, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের নিষ্ক্রিয়তায় ধারাবাহিকভাবে নিম্নমুখী হয়েছিল পুঁজিবাজারের সার্বিক লেনদেন। এ সময় বাজারের গড় লেনদেন ৩০০ কোটির ঘরে নেমে আসে।

এদিকে, গতমাসে গড় লেনদেন আবারো ৪৫৫ কোটি টাকায় পৌঁছলে চলতি মাসের শুরু থেকেই মিশ্র প্রবণতায় চলছে লেনদেন। এদিকে, বাজারে সূচকের তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি। বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কয়েকটি ইস্যুকে ঘিরেই নিম্নমুখী রয়েছে বাজারের সার্বিক সূচক ও লেনদেন।

প্রথমত, নতুন তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর মুনাফায় ধস : বিগত ৩ বছরে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত অধিকাংশ কোম্পানির মুনাফা কমেছে ধারাবাহিকভাবে।
এর মধ্যে বিগত বছরে তালিকাভুক্ত ফারইস্ট ফাইন্যান্স, সুহ্রদ ইন্ডাস্টিজ, প্রাইম ফাইন্যান্স, কোম্পানিটি ‘নো ডিভিডেন্ড’ ঘোষণা করেছে। তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর মুনাফার ভাটায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থার সংকট দেখা দিয়েছে।

দ্বিতীয়ত, দেশীয় কোম্পানিগুলোর আর্থিক প্রতিবেদনে অস্বচ্ছতা : তাদের মতে, তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর রাজনৈতিক অস্থিরতাকে পুঁজি করে আর্থিক প্রতিবেদনে মুনাফার পরিমাণ কম দেখাচ্ছে দেশীয় মালিকানাধীন কোম্পানিগুলো। পাশাপাশি কোম্পানিগুলোর নিম্নমুখী প্রবণতায় নো ডিভিডেন্ড ঘোষণা করেছে তালিকাভুক্ত বেশকিছু কোম্পানি। এছাড়াও অন্যান্য কোম্পানিগুলোর মুনাফার চিত্র নিম্নমুখী হওয়ায় বিনিয়োগকারীদের মনে কোম্পানিগুলোর প্রতি আস্থা সংকট সৃষ্টি হয়েছে।

বিনিয়োগকারীদের মতে, বহুজাতিক কোম্পানিগুলো যখন রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও বিগত বছরের তুলনায় ভালো মুনাফা দেখাচ্ছে তখন দেশীয় কোম্পানিগুলোর মুনাফা কমার নেপথ্যে কারসজি ও অর্থ চুরির মতো বিষয় থাকতে পারে।

তৃতীয়ত, মৌলভিত্তির কোম্পানিগুলো শেয়ারের চাহিদার তুলনায় জোগানের ঘাটতি : এদিকে, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর মধ্যে মৌলভিত্তির কোম্পানিগুলোর অধিকাংশেরই শেয়ারের চাহিদার তুলনায় জোগানের ঘাটতি রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীরা উচ্চমূল্যে শেয়ার ক্রয় করতে পারছেন। অন্যদিকে, কম মৌলভিত্তির কোম্পানিগুলোর অধিকাংশেরই উদ্যোক্তা পরিচালকদের হাতে পর্যাপ্ত পরিমাণ শেয়ার না থাকলেও নিয়ন্ত্রক সংস্থার পক্ষ থেকে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে না।

চতুর্থত, নতুন বিনিয়োগকারীর সম্পৃক্ততা কম : বাজারের ধারাবাহিকতার পেছনে বিনিয়োগকারীদের সম্পৃক্ততা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু ২০১০ সালের ধস পরবর্তী সময়ে ধারাবাহিক সূচকের নিম্নমুখী প্রবণতার মধ্যে প্রচুর পরিমাণ বিও অ্যাকাউন্ট খোলা হলেও সেকেন্ডারি মার্কেটে বিনিয়োগকারীদের সম্পৃক্ততা না থাকায় বাজারে লেনদেনের গতিশীলতা বাড়ছে না। অন্যদিকে, বাজারের মধ্যে ধারাবাহিক অস্থিরতা বিরাজ করায় নতুন বিনিয়োগকারীরাও বাজারের ফিরছে না।

পঞ্চমত, নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রতি বিনিয়োগকারীদৈর আস্থাহীনতার অভাব রয়েছে। আমাদের দেশের বর্তমান আইপিও প্রক্রিয়া (ডিসক্লোজার) বিভিন্ন সময় নানা মহলের কাছে আলোচনায় এসেছে। এ প্রক্রিয়ায় নতুন কোম্পানি তালিকাভুক্ত হলেও পরবর্তীতে তাদের মুনাফা কমছে। ফলে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। তাই, ডিসক্লোজার ভিত্তিক আইপিও অনুমোদনের পরিবর্তন এনে মেরিট ভিত্তিক আইপিও অনুমোদন দেওয়া উচিত।

এ বিষয়ে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) পরিচালক শাকিল রিজভী বলেন, বর্তমান বাজার প্রেক্ষাপটে বিনিয়োগকারীদের মাঝে কিছুটা আস্থাহীনতা রয়েছে। তবে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে একটি ধারণা তৈরি হয়েছিল, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর শেয়ারবাজারবান্ধব নন, গভর্নর শেয়ারবাজারের বিকাশে নানা রকমের প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছেন।  এতে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে। তাই গভর্নরের পদত্যাগে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে একটি ইতিবাচক মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব পড়েছে, যা লেনদেন বাড়াতে সহায়তা করেছে বলে আমি মনে করছি।

ডিএসইর সাবেক সদস্য আহমেদ রশিদ লালী বলেন, পুঁজিবাজার ইস্যুতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা থেকে শুরু করে সরকারের নমনীয় মনোভাব জরুরি। সরকার পুঁজিবাজার স্থিতিশীলণ করতে নানা পদক্ষেপ নিলেও বাজার স্থিতিশীল হচ্ছে না। কারণ, নতুন আইন তৈরি এবং আবারো ওই আইনগুলোর সংশোধনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। শুধু আইন প্রণয়ন বা সংশোধন করলেই বাজারের স্থিতিশীলতা বা লেনদেনের গতি বাড়বে না। এজন্য প্রয়োজন যুগোপযোগী কিছু সিদ্ধান্ত।

Leave A Reply