Deshprothikhon-adv

তারল্য সংকটে পুঁজিবাজার টালমাতাল অবস্থায়

0

dse-cseআফজাল হোসেন লাভলু, ঢাকা: পুঁজিবাজারে বেশ কিছুদিন ধরে বাজার টালমাতাল পরিস্থিতি বিরাজ করছে। বাজারের টালমাতাল পরিস্থিতি বিরাজ থাকায় বিনিয়োগকারীরা লেনদেন বিমুখ হয়ে পড়ছেন। অধিকাংশ বিনিয়োগকারীরা আস্থাহীনতা থাকায় নতুন করে বিনিয়োগ করার ভরসা পাচ্ছেন না। এছাড়া বাজার আজ ভালো তো কাল খারাপ।

এতে বিনিয়োগকারীরা বাজারের গতিবিধি সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা পাচ্ছেন না। ফলে এক দিকে যেমন তারা নতুন করে বিনিয়োগ করতে সাহস পাচ্ছেন না, অন্যদিকে কেনা শেয়ারও বিক্রি করতেও সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না। যার ফলে পুঁজিবাজারের প্রাত দিন দিন আস্থা হারিয়ে ফেলছেন লাখ লাখ বিনিয়োগকারী।

একাধিক বিনিয়োগকারীরা বলেন, চলমান বাজারের গতি তারা বুঝে উঠতে পারছেন না। দীর্ঘ সাড়ে ৫ বছর ধরে একটি স্থিতিশীল বাজারের প্রত্যাশায় রয়েছি। কিন্তু সে প্রত্যাশা আজো সফলতার মুখ দেখেনি। মাঝে মধ্যে সূচক কিছুটা বাড়তে দেখা গেছে। এতে বাজার নিয়ে কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও পুরোপুরি শঙ্কা কাটেনি বিনিয়োগকারীদের। যদিও বাজারের স্বাভাবিক ধারা ফিরিয়ে আনতে নানা ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছিল। কিন্তু প্রয়োজনীয় নীতিমালা এবং যথাযথ বাস্তবায়নের অভাবে স্থিতিশীল পরিবেশ ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি। ফলে বাজারে যা হবার তাই হচ্ছে।

এম সিকিউরিটিজের বিনিয়োগকারী আওলাদ হোসেন বলেন, পুঁজিবাজারের এ পরিস্থিতি জন্য সরকারসহ নিয়ন্ত্রক সংস্থা দায়ী। তারা সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে না পারায় বাজার আজ ভাল হচ্ছে আবার কাল খারাপ হচ্ছে। বর্তমান পুঁজিবাজার কারসাজি চক্র নিয়ন্ত্রক করছে। তাদেও ইচ্ছায় সুচক বাড়ে তাদেও ইচ্ছায় দরপতন ঘটে। বর্তমান বাজার যে কোন দিকে যাচ্ছে তা আমাদের বোধগম্য নয়।

অভিজ্ঞ বিনিয়োগকারী মাহামুদুল আলম বলেন, পুঁজিবাজার স্থিতিশীল করা সরকারের একার পক্ষে সম্ভব নয়। তবে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যকরী পদক্ষেপ না থাকায় বাজার স্থিতিশীল ভেস্তে যাচ্ছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা দীর্ঘ দিন স্থিতিশীল অবস্থায় ফেরাতে ব্যর্থ হয়েছে। অথচ এখনোও তিনি দায়িত্ব পালন করছেন।

এদিকে সপ্তাহজুড়ে পুঁজিবাজারে ধারাবাহিক দরপতন কিছুটা কমলেও চাঞ্চল্য ফেরেনি লেনদেনে। গেল সপ্তাহে উভয় পুঁজিবাজারে মূল্যসূচক কিছুটা বাড়লেও কমেছে টাকার অংকে দেনদেনের পরিমাণ। তারুল্য সংকটে গত ছয় কার্যদিবস লেনদেন ঘুরপাক খাচ্ছে ৩০০ কোটির ঘরে। এর ধারাবাহিকতায় সপ্তাহের ব্যবধানে দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) লেনদেন কমেছে ৬২৮ কোটি টাকা।

পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে অনেক নতুন কোম্পানি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হচ্ছে। লেনদেনের অপেক্ষমান নতুন কোম্পানিগুলোতে বিনিয়োগকারীদের শত শত কোটি টাকা আটকে আছে। অন্যদিকে সীমাবদ্ধতার কারণে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরাও চাহিদা অনুসারে বিনিয়োগ করতে পারছে না। এছাড়াও বাজারের প্রতি আত্মবিশ্বাসের অভাবে লোকসানের ভয়ে সেকেন্ডারি মার্কেটে আসছে না নতুন বিনিয়োগকারীরা। ফলে বাজারে দেখা দিয়েছে তারল্য সংকট। ধারাবাহিকভাবে কমছে লেনদেন প্রবাহ।

বাজার পর্যালোচনায় দেখা গেছে, গত সপ্তাহে দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) টাকার অংকে লেনদেন হয়েছে ১ হাজার ৬১৪ কোটি ৬৪ লাখ ৬৩ হাজার ৪৫৮ টাকার। যা এর আগের সপ্তাহের চেয়ে ৬২৮ কোটি ৬৬ লাখ টাকা বা ২৮ দশমিক ০২ শতাংশ কম।

আগের সপ্তাহে ডিএসইতে লেনদেন হয়েছিল ২ হাজার ২৪৩ কোটি ৩০ লাখ ৭৭ হাজার ৯১৪ টাকার। একই সঙ্গে গত সপ্তাহে ডিএসইতে কমেছে টার্নওভারের পরিমাণ। গড়ে প্রতিদিন টার্নওভার হয়েছে ৩২২ কোটি ৯২ লাখ টাকা। যা তার আগের সপ্তাহে ছিল ৪৪৮ কোটি ৬৬ লাখ টাকা।

অর্থাৎ সপ্তাহের ব্যবধানে টার্নওভার কমেছে ১২৫ কোটি ৭৩ লাখ টাকা বা ২৮ দশমিক ০২ শতাংশ কম। সপ্তাহ শেষে ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স বেড়েছে ১১ পয়েন্ট বা দশমিক ২৬ শতাংশ। ডিএস৩০ সূচক বেড়েছে ২ পয়েন্ট বা দশমিক ১৪ শতাংশ। আর শরীয়াহ বা ডিএসইএস সূচক কমেছে দশমিক ৮০ পয়েন্ট বা দশমিক ০৭ শতাংশ।

গেল সপ্তাহে ডিএসইতে তালিকাভুক্ত মোট ৩৩০টি কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ডের শেয়ার লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে দর বেড়েছে ১৬৩ টির, কমেছে ১২৪টির এবং অপরিবর্তিত রয়েছে ৩৮টির। আর লেনদেন হয়নি ৫ টি কোম্পানির শেয়ার।

গেল সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবস রোববার লেনদেন শুরুতে বাজার মূলধন ছিল ৩ লাখ ১০ হাজার ৩৫৬ কোটি ১৪ লাখ ১০ হাজার ৩৬৯ টাকায়। যা সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসে বৃহস্পতিবার লেনদেন শেষে বাজার মূলধন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ১০ হাজার ৭৭২ কোটি ১৭ লাখ ৮ হাজার ৮২৪ টাকায়। অর্থাৎ সপ্তাহের ব্যবধানে বাজার মূলধন বেড়েছে ৪১৬ কোটি ২ লাখ ৯৮ হাজার টাকা বা  দশমিক ১৩ শতাংশ। সপ্তাহের ব্যবধানে বাজারের সার্বিক মূল্য আয় অনুপাত (পিই রেশিও) দশমিক ২২ শতাংশ কমে ১৪ দশমিক ৯২ পয়েন্টে অবস্থান করছে।

অন্যদিকে দেশের অপর শেয়ারবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সপ্তাহে সিএএসপিআই সূচক বেড়েছে দশমিক ১৬ শতাংশ। সিএসই৩০ সূচক বেড়েছে দশমিক ০১৬ শতাংশ। আর সার্বিক সূচক সিএসইএক্স বেড়েছে দশমিক ১৬ শতাংশ।

সপ্তাহে সিএসইতে গড়ে মোট লেনদেন হয়েছে ২৭৮ টি কোম্পানির শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিটের। এর মধ্যে দাম বেড়েছে ১৩৯ টির, কমেছে ১১১টির এবং অপরিবর্তিত রয়েছে ২৮টির। টাকার অংকে লেনদেন হয়েছে ১২৪ কোটি ৮৩ লাখ ৮০ হাজার টাকার।

ডিএসইর সাবেক সিনিয়র সহ-সভাপতি আহম্মেদ রশিদ লালী বলেন, বেশ কয়েকটি নতুন কোম্পানি প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে শেয়ারবাজারে আসছে। কোম্পানিগুলোতে বিনিয়োগকারীদের প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০ কোটি টাকা আটকে আছে। এসব কোম্পানি লেনদেন শুরু করলে বাজারে কিছুটা তারল্য সংকট কমবে লেনদেন প্রবাহ বাড়বে বলে মনে করেন তিনি।

বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমবিএ) সভাপতি ছায়েদুর রহমান বলেন, লেনদেনের মূল সোর্স অর্থ। পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরাতে অর্থের জোগান বাড়াতে হবে। এছাড়া বাজারে কিভাবে লেনদেনের গতি বাড়বে সে বিষয়ে স্টেক হোল্ডারদের সঙ্গে আলোচনা চলছে। তবে আশা করি শিগগিরই বাজারে লেনদেনে গতি ফিরবে।

Leave A Reply