Deshprothikhon-adv

প্রশ্নবিদ্ধ ডিভিডেন্ড দিয়ে মূলধণ বৃদ্ধি রিজেন্ট টেক্সটাইলের পর্ব ১

0

regent tex lagoআলী ইব্রাহিম: পুঁজিবাজারে সম্প্রতি তালিকাভুক্তির অনুমোদন পেয়েছে বস্ত্রখাতের কোম্পানি রিজেন্ট টেক্সটাইলের লিমিটেডের তালিকাভুক্তির আগে পরিশোধিত মূলধন অনেক দ্রুত বৃদ্ধি করেছে। প্রসপেক্টাসে প্রকাশিত তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায় কোম্পানির পরিশোধিত মূলধন বেড়েছে রহস্যজনকভাবে।

একযুগের বেশি সময় পাবলিক লিমিটেড থাকার পরও ডিভিডেন্ড না দেয়া এ কোম্পানি বাজারে আসার আগে বিপুল পরিমান ডিভিডেন্ড ঘোষণা করে। আর এসব বিষয় নিয়েই সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বিনিয়োগকারীরা অভিযোগের সুরে বলেন, নাম সর্বস্ব কোম্পানি বিনিয়োগকারীদের টাকা লুটপাটের জন্য পুঁজিবাজারে আসছে। আর এ গানি বহন করতে হচ্ছে সাধারন বিনিয়োগকারীদের।

পুঁজিবাজারের বর্তমান পরিস্থিতিতে সাপ্লাই ও ডিমান্ডের মধ্যে সমন্বয়ের নাম করে গত দুই-তিন বছরের যেসব কোম্পানিকে আইপিওর মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহের অনুমোদন দেয়া হয়েছে, তার অধিকাংশই দুর্নীতিপরাছু পরিচালকদের দ্বারা পরিচালিত দুর্বল কোম্পানি। শুধু কাগুজে দলিলাদির (ডিউ ডিল্যান্স সার্টিফিকেট) ওপর নির্ভর করে দেয়া হয়েছে এসব অনুমোদন।

এক্ষেত্রে অধিকাংশ কোম্পানির তৈরি করা এসব কাগুজে দলিলাদি সরেজমিনে যাচাই করা হয়নি। এ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে করা বিনিয়োগকারী ও বাজার-সংশ্লিদের আলোচনা-সমালোচনায় নিয়ন্ত্রক সংস্থার কর্তা-ব্যক্তিদের উদাসীন মানসিকতায় পরিবর্তন আনতে ব্যর্থ হয়েছে। সম্প্রতি আইপিওর মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহের জন্য অনুমোদন পাওয়া রিজেন্ট টেক্সটাইলের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয়নি।

অভিযোগ রয়েছে, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির অপেক্ষায় থাকা রিজেন্ট টেক্সটাইলের লিমিটেড প্রসপেক্টাসে মিথ্যা ও বানোয়াট তথ্য প্রদানের মাধ্যমে আইপিওর মাধ্যমে অর্থ উত্তোলনের প্রাথমিক ধাপ সম্পন্ন করেছে। অথচ এখন পর্যন্ত নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি ও স্টক এক্সচেঞ্জের কোনো প্রতিনিধিই কোম্পানিটি সরেজমিনে পরিদর্শন করেননি।

শুধু কোম্পানির ইস্যুয়ারের (লঙ্কাবাংলা ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড) ডিউ-ডিল্যান্স সাটিফিকেটের উপর ভিত্তি করে কোম্পানিটির আইপিও অনুমোদন প্রদান করা হয়েছে। প্রশ্নবানে জর্জরিত এ কোম্পানির অনিয়মের ওপর করা অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের প্রথম পর্ব প্রকাশিত হচ্ছে আজ।

দৈনিক দেশ প্রতিক্ষণের অনুসন্ধানে দেখা যায়, আইপিও অনুমোদন পাওয়া এ কোম্পানিটিতে এখন পর্যন্ত পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা কিংবা স্টক এক্সচেঞ্জের কোনো প্রতিনিধি দল সরেজমিনে অনুসন্ধানে যায়নি। পাশাপাশি কোম্পানিটির আইপিও অনুমোদন দেয়া হলেও প্রসপেক্টাসে বিভিন্ন তথ্যের গরমিল রয়েছে।

কোম্পানির প্রসপেক্টাসের তথ্য অনুযায়ি, কোম্পানি ১৯৯৪ সালে পাবলিক লিমিটেড কোম্পানিতে রুপান্তরিত হলেও ২০১০ সাল পর্যন্ত বিনিয়োগকারীদের ডিভিডেন্ড দেয়ার কোনো তথ্য উপস্থাপন করতে পারেনি।

২০১১ সালে কোম্পানি প্রথমবারের মত বিনিয়োগকারীদের জন্য ১০০ শতাংশ ডিভিডেন্ড ঘোষণা করে। এর মধ্যে ৫০ শতাংশ ক্যাশ এবং ৫০ শতাংশ স্টক। এর পরের বছর আবার ১৩৩.২৪ শতাংশ ডিভিডেন্ড ঘোষণা করে। সেবারও ৬৬.৬৭ শতাংশ করে ক্যাশ ও স্টক ডিভিডেন্ড ঘোষণা করে।

২০১১ সালে কোম্পানি শেয়ার প্রতি আয় করে (ইপিএস) ৩.৩৪ টাকা। অথচ কোম্পানি সে বছরই ডিভিডেন্ড দেয়া হয় শেয়ার প্রতি ৫০ শতাংশ ক্যাশ এবং ৫০ শতাংশ স্টক। অর্থাৎ শেয়ার প্রতি বিনিয়োগকারীদের সে বছর ১০ ফেসভ্যালু অনুসারে প্রতিটি শেয়ারে ৫ টাকা ক্যাশ এবং প্রতি ১০০ শেয়ারে ৫০টি বোনাস শেয়ার দেয়া হয়।

আবার পরের বছর ২০১২ সালে কোম্পানির শেয়ার প্রতি আয় (ইপিএস) হয় ২.২২ টাকা আর সে বছরে বিনিয়োগকারীদের ডিভিডেন্ড দেয়া হয় ৬৬.৬৭ শতাংশ ক্যাশ এবং ৬৬.৬৭ শতাংশ স্টক। অর্থাৎ ওই বছরে শেয়ার প্রতি বিনিয়োগকারীদের সে বছর ৬.৬৭ টাকা ক্যাশ এবং প্রতি ১০০ শেয়ারে ৬৬.৬৭টি বোনাস শেয়ার দেয়া হয়। অর্থাৎ ডিভিডেন্ড অনুযায়ী আয় না থাকলেও কোম্পানি রিজার্ভ ভেঙ্গেই ডিভিডেন্ড দিয়ে এসেছে।

আর দু বছরের ডিভিডেন্ডের মাধ্যমেই কোম্পানি পরিশোধিত মূলধন একলাফে আড়াইগুণ করে ফেলা হয়েছে। সর্বশেষ ২০১৩ সালে কোম্পানি ২০ শতাংশ করে ক্যাশ ও স্টক ডিভিডেন্ড দেয়। এর পরেরবারই আবার দু বছর ডিভিডেন্ড দেয়া বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। অথচ ওই দু বছর কোম্পানির ব্যবসায় বড় ধরনের কোনো সফলতা আসেনি।

উল্টো ২০১২ সালে কোম্পানির মুনাফার পরিমান বিগত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন ছিল। আর সেবারই কোম্পানি সর্বোচ্চ পরিমান ডিভিডেন্ড ঘোষণা দেয়। ডিভিডেন্ড দেয়ার এ প্রবনতা থেকে দেখা যায়, কোম্পানির ভিত শক্তিশালী না করেই পরিশোধিত মূলধণ বাড়ানোর জন্য বড় ধরনের ডিভিডেন্ড ঘোষণা করা হয়েছে।

তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, ২০১২ সালে যেখানে কোম্পানির পরিশোধিত মূলধণ ছিল ৫০ কোটি টাকা তা ২০১৩ তে গিয়ে ৬০ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বরের স্থিতি অনুযায়ি কোম্পানির পরিশোধিত মূলধণ একই পরিমান অর্থাৎ দেখান হয়েছে মাত্র ৬০ কোটি টাকা। আর এ কোম্পানিই বছর ঘুরতে না ঘুরতেই এখন ১২৫ কোটি টাকা উত্তোলনের অনুমোদন পাচ্ছে।

উল্লেখ্য, বিএসইসি’র ৫৫২তম সভায় রিজেন্ট টেক্সটাইলের আইপিও অনুমোদন পায়। ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের সাথে ১৫ টাকা প্রিমিয়াম দিয়ে প্রতি শেয়ারে ২৫ টাকা নির্দেশক মূল্য ধার্য করা হয়। কোম্পানি ৫ কোটি শেয়ার ছেড়ে বাজার থেকে ১২৫ কোটি টাকা উত্তোলনের অনুমতি পেয়েছে।

এ বিষয় কোম্পানির সচিব এম আর এস সিকদার দৈনিক দেশ প্রতিক্ষণকে জানান, ডিভিডেন্ট হচ্ছে কোম্পানির পরিচালনা পর্যদের বিষয়। এ বিষয় কোম্পানির পরিচালনা পর্যদ যা ভালো মনে করছেন সেই হিসেবে ডিভিডেন্ট ঘোষনা করছে। এছাড়া অনেক প্রশ্নের উত্তর তিনি এড়িয়ে গিয়ে মুঠোফোন কেটে দেন।

পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞ আবু আহম্মেদ দৈনিক দেশ প্রতিক্ষণকে বলেন, বোনাস শেয়ারে কোম্পানির উদ্যোক্তারই বেশি উপকৃত হন। সেক্ষেত্রে বোনাস শেয়ার ফলে কোম্পানির শেয়ারের দাম পড়ে যায়। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হন বিনিয়োগকারীরা। এক পর্যায়ে বোনাস শেয়ার কাল হয়ে দাঁড়ায় বিনিয়োগকারীদের।

কোম্পানির সিএফও অঞ্জন কুমার ভট্টাচার্যের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলো তিনি এ বিষয় কথা ভরতে অপরাগতা প্রকাশ করেন। সেই সাথে পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দেন আপনি কি আমার কোম্পানির শেয়ার হোল্ডার। বিনিয়োগকারীদের স্বার্থে কথা বলছি এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বনে, আগে আমরা বাজারে আসি। তারপর কথা বলব।

অভিজ্ঞ বিনিয়োগকারী এ্যাড. মাহামুদুল আলম দৈনিক দেশ প্রতিক্ষণকে বলেন, বর্তমানে দুর্বল কোম্পানিগুলো পুঁজিবাজারে আসছে। এটা বাজারের জন্য অশনিসংকেত। নিয়ন্ত্রক সংস্থার এই বিষয় আরো তদারকির প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।

Leave A Reply